শুক্রবার, মে ২৭, ২০২২

বিডি ফাইন্যান্সের সাথে এসআইজির সমঝোতাঃ কারসাজি সন্দেহে তদন্তে বিএসইসি

পুঁজিবাজার রিপোর্টঃ শেয়ারবাজারে আর্থিক খাতে তালিকাভুক্ত কোম্পানি বিডি ফাইন্যান্স ও মার্কিন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান সভরিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার গ্রুপের (এসআইজি) মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে বিশদ জানতে চেয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। উভয় পক্ষের চুক্তি স্বাক্ষরের আর্থিক প্রভাব সম্পর্কিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য (পিএসআই) তদন্তের সিদ্ধান্ত নিয়ে সংস্থাটি চিঠি দিয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে (ডিএসই)। শিগগিরই বিষয়টি তদন্ত সাপেক্ষে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন বিএসইসিতে দাখিল করার জন্য ডিএসইকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

ডিএসই’র তদন্ত কমিটিঃ ৭ দিনে প্রতিবেদন

সম্প্রতি ডিএসই’র ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে এ সক্রান্ত একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে। একই সঙ্গে বিষয়টি চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) ও বিডি ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে অবহিত করা হয়েছে।

রবিবার চিঠি পেয়ে, বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ইতোমধ্যে লিস্টিং বিভাগের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে ডিএসই; সাত দিনের মধ্যে কমিটি বিএসইসির কাছে প্রতিবেদন জমা দিতে কাজ করছে বলে নিশ্চিত করেছেন, ডিএসইর চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) এম সাইফুর রহমান মজুমদার। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, চলতি বছরের ৯ এপ্রিল বিডি ফাইন্যান্স ও ২৬ এপ্রিল ডিএসই’র এ সংক্রান্ত বিষয়ে চিঠি পাওয়া গেছে। ফলে বিডি ফাইন্যান্স ও সভরিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার গ্রুপের মধ্যে মেমোরেন্ডাম স্বাক্ষরের আর্থিক প্রভাব সম্পর্কিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্যের তদন্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করে বিএসইসি। এরই ধরাবাহিকতায় এই চিঠি প্রাপ্তির সাত কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত সাপেক্ষে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন বিএসইসিতে দাখিল করতে বলা হলো।

এদিকে ডিএসই মঙ্গলবার তালিকাভুক্ত নন-ব্যাঙ্ক আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে (এনবিএফআই) একটি চিঠি পাঠিয়েছে; যেখানে এপ্রিল মাসে ওয়াশিংটন ডিসির বাংলাদেশ দূতাবাসে স্বাক্ষরিত এমওইউ প্রসঙ্গে বিভিন্ন তথ্য ও খুঁটিনাটি বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়।

কেন তদন্তে বিএসইসি

চার বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে নিবন্ধিত হয় ‘সভরেইন ইনফ্রাস্ট্রাকচার গ্রুপ (এসআইজি)’ নামের এ কোম্পানি। ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবা দেয়ার উদ্দেশ্যে গড়ে তোলা কোম্পানিটির মোট মূলধন ১ কোটি ডলারেরও কম। কর্মীসংখ্যাও সাকুল্যে ১০ জন। অথচ ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা এ কোম্পানিই ২০ কোটি ডলার বা প্রায় ১৭ হাজার ১২২ কোটি টাকা (ডলারপ্রতি ৮৫.৬ টাকা হিসাবে) বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশে। এ ঘোষণা এসেছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিডি ফাইন্যান্সের মাধ্যমে। যদিও প্রতিষ্ঠানটির মোট মূলধন ৩০০ কোটি টাকা। আর তাদের মোট সম্পদ ও দায়ের পরিমাণও ২ হাজার কোটি টাকার কম।

এ ঘোষণাকে কেন্দ্র করে গত এক বছরে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারদর ছয় গুণের বেশি বেড়েছে। এরপরেই সংশ্লিষ্ট মহল নড়েচড়ে বসে। মার্কিন প্রতিষ্ঠান এসআইজির ২০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের সক্ষমতা নিয়েই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে তখন। দেশে বড় বড় ব্যাংক থাকতে হঠাৎ করে বিডি ফাইন্যান্সের মতো ছোট একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকার বিদেশী বিনিয়োগ আসার সংবাদে বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছে। এ নিয়ে দেশের আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা উষ্মাও প্রকাশ করেছেন।

এসআইজি কোন খাতে বা প্রকল্পে বিনিয়োগ করবে, সেটিই ঠিক হয়নি। আকাশকুসুম ঘোষণাটি যদি পুঁজিবাজারে বিডি ফাইন্যান্সের শেয়ারদর বাড়ানোর জন্য দেয়া হয়ে থাকে, সেটি দুঃখজনক বলে মনে করেন তারা। তখন থেকেই আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি থেকে এ বিষয়ে পরিষ্কার ব্যাখ্যা তলব করার ব্যপারে দাবি ওঠে সংশ্লিষ্ট মহল থেকে।

কি ছিলো সমঝোতা স্মারকে

উল্লেখ্য, চলতি বছরের গত ৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে বিডি ফাইন্যান্সের ও মার্কিন বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান সভরিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার গ্রুপের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে , যেখানে বিদেশি প্রতিষ্ঠানটি সম্ভাব্য ২ বছরে বাংলাদেশে ২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে। বিডি ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কায়ছার হামিদ এবং সভরিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ল্যারি নক্স নিজ নিজ পক্ষে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেন। পরবর্তীতে ১১ এপ্রিল এ চুক্তির বিষয়টি ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়, যার মাধ্যমে দেশের বিনিয়োগকারীদের এ বিষয়ে জানতে পারেন।

এমওইউতে সম্ভাব্য বিনিয়োগ তিনটির মধ্যে- সেকেন্ডারি মার্কেট থেকে বিডি ফাইন্যান্সের শেয়ার কেনা, বিডি ফাইন্যান্সকে ৪০ মিলিয়ন ডলার লোন দেওয়া (মূলত টেকসই অর্থায়ন পোর্টফোলিওকে শক্তিশালী করার জন্য) এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অনেক বড় বিনিয়োগের ব্যবস্থা করা; এসব প্রকল্পে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সের স্ট্রাকচারাল ফাইন্যান্স টিম সভরেন ইনফ্রাস্ট্রাকচার গ্রুপের লোকাল অংশীদার হিসেবে কাজ করবে এমন উল্লেখ রয়েছে।

এমওইউতে উল্লেখ করা হয়, বিডি ফাইন্যান্সের মাধ্যমে সভরিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার গ্রুপ বাংলাদেশের অবকাঠামোগত খাতে প্রায় ২০০ কোটি ডলার অর্থায়নের আগ্রহ রয়েছে। সরকার বা পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপে (পিপিপি) ঋণ ও ইকুইটি সহায়তা এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চলে অর্থায়ন করতে চায় এসআইজি।

একইসঙ্গে বিডি ফাইন্যান্সে প্রাথমিকভাবে ৪ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করবে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এই ৪ কোটি ডলার বিনিয়োগ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, পরিবেশবান্ধব প্রকল্প, নারী উদ্যোক্তা, সামাজিক আবাসন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে বিনিয়োগ করা হবে।

এমওইউতে, দুই অংশীদার কাজ করার তিনটি পদ্ধতি এবং বিনিয়োগ আনার ক্ষেত্রে ডকুমেন্টেশনের লিগ্যাল ভেটিং, বিভিন্ন টেকনিক্যাল শর্ত ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা রয়েছে।

বিডি ফাইন্যান্সে প্রাথমিকভাবে ৪ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ সুবাদে এর পরিচালনা পর্ষদে যুক্ত হতে পারে সভরিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার গ্রুপ। সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী এসআইজি যদি ৪ শতাংশ শেয়ার নিশ্চিত করে তবে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সের বোর্ডে তাদের প্রতিনিধিত্ব থাকবে।

spot_img

অন্যান্য সংবাদ