সোমবার, সেপ্টেম্বর 26, 2022

পিপলস লিজিং চালু করতে সর্বাত্বক সাহায্য করবে বিএসইসি

পুঁজিবাজার রিপোর্টঃ পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠান পিপলস পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের (পিএলএফএসএল) কার্যক্রম আবার চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে সর্বাত্মক সহযোগিতা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

মঙ্গলবার বিএসইসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কমিশন সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কমিশন সভা শেষে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ রেজাউল করিম এ তথ্য জানিয়েছেন।

তিনি জানান, সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশনের নির্দেশনা মোতাবেক ২২ নভেম্বর আদালত কর্তৃক পিপলস লিজিং ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের নবগঠিত পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে আলোচনা হয়। আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, বিএসইসি বিশেষ নিরীক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে পিএলএফএসএলের ২০১৩ থেকে ২০২১ সালের সমাপ্ত বছরের নিরীক্ষিত ও অনিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী ও অন্যান্য কার্যক্রমের ওপর বিশেষ নিরীক্ষা কর্যক্রম পরিচালনা করবে।

সেই সঙ্গে আরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক এবং পিএলএফএসএলের বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে আলোচনাপূর্ব আর্থিক পুনর্গঠনের বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে কোম্পানির কার্যক্রম চালু করতে কমিশন থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা দেওয়া হবে।

লোকসানের শুরু ২০১৫ থেকে

উল্লেখ্য, আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পিপলস লিজিংকে ১৯৯৭ সালের ২৪ নভেম্বর অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর থেকে প্রতিষ্ঠানটি গ্রাহকের কাছ থেকে মেয়াদি আমানত ও বিভিন্ন ব্যাংক-আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা ধার করে ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। ২০০৫ সালে সেটি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। ২০১৫ সাল থেকে কোম্পানিটির ধারাবাহিকভাবে লোকসান হতে থাকে। খেলাপি প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা আদায় করতে না পারায় আমানতকারীদের টাকাও ফেরত দিতে পারেনি তারা।

২০১৮ সালের ডিসেম্বরে প্রতিষ্ঠানটির আমানত ছিল ২ হাজার ৩৬ কোটি টাকা। আর ঋণের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ১৩১ কোটি টাকা, এর মধ্যে খেলাপিই ৭৪৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ খেলাপি ঋণের হার ৬৬ শতাংশ।

দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনার কারনে অবসানের প্রস্তাব

২০১৯ সালের জুলাইয়ে আলোচিত ব্যাংকার পি কে হালদারের ঋণ কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস কার্যক্রম বন্ধের উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন দেয়। অনিয়ম দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনায় চরম সংকটে থাকা কোম্পানিটি আর্থিক অক্ষমতা নিয়ে ধুকতে থাকলে ২০১৯ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পিপলস লিজিংকে অবসায়নের পক্ষে সম্মতি দেয় সরকার।

এছাড়া অবসায়ন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগের উপ-মহাব্যবস্থাপক পদমর্যাদার একজনকে অবসায়ক নিয়োগ দিতে বলা হয়। পরে সাময়িক অবসায়ক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক আসাদুজ্জামান খানকে নিয়োগ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

কারসাজির আশংকায় লেনদেন বন্ধ

বাংলাদেশ ব্যাংক কোম্পানিটি অবসায়নের উদ্যোগ নিলে শেয়ারহোল্ডাররা আতঙ্কে পানির দরে শেয়ার বিক্রির চেষ্টা করেন। কিন্তু দফায় দফায় দাম কামানোর পরও বিক্রেতা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।

এ পরিস্থিতিতে কারসাজির শঙ্কায় কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন বন্ধ করে দেয় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পর্ষদ। প্রথমিকভাবে ডিএসইর পর্ষদ সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যতদিন কোম্পানিটির অবসায়নের বিষয়ে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসবে লেনদেন বন্ধ থাকবে।

তবে এরপর ১৫ দিন করে শেয়ার লেনদেন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তারই ধারাবাহিকতায় ১৫ দিন করে ডিএসই কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন বন্ধ রাখে। ২০১৯ সালের ১৪ জুলাই থেকে শেয়ারবাজারে কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন বন্ধ রয়েছে।

স্থগিতের আগে কোম্পানিটির ১০ টাকার শেয়ারদর দাঁড়ায় ৩ টাকায়।

নতুন পর্ষদ ও খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যবস্থা

এরপর চলতি বছরের ১৩ জুলাই বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকারের একক ভার্চুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ এক আদেশে পিপলস লিজিংয়ের পুনরুজ্জীবিত করতে ১০ সদস্যের পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে দেয়। কোম্পানিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয় সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী কামাল-উল আলমকে।

২০১ জন আমানতকারীর শুনানি নিয়ে বিচারপতি মোহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকারের হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেন। গত ২১ জানুয়ারি পিএলএফএসএল থেকে ৫ লাখ টাকার বেশি টাকা ঋণ নিয়ে খেলাপি হয়েছেন, এমন ২৮৬ জন ঋণ গ্রহীতাকে তলব করেন হাইকোর্ট।

সাময়িক অবসায়ক আসাদুজ্জামান খানের দেওয়া তালিকা দেখার পর সেদিন এ আদেশ দেন উচ্চ আদালত। ওই দিনের আদেশে আদালত ২৮৬ জনকে দুই ভাগে হাজির হতে দিন নির্ধারণ করে দেন। তাদের মধ্যে ১২২ ঋণ খেলাপি নির্ধারিত তারিখে আদালতে হাজির হননি।

এদিকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম, দুর্নীতি বন্ধে সমন্বিতভাবে কীভাবে কাজ করা যায়, সে বিষয়ে গত ৯ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) চেয়ারম্যানের বক্তব্য শোনেন আদালত।

তাদের বক্তব্য শোনার পর তলবে হাজির না হওয়া ১২২ জনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। ওই আদেশে বলা হয়, পরবর্তী আদেশ না হওয়া পর্যন্ত তারা যেন দেশত্যাগ করতে না পারেন, সেজন্য সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সতর্ক এবং সজাগ থাকতে নির্দেশ দেওয়া হলো।

এদিকে পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিনান্সিয়াল সার্ভিস লিমিটেডের (পিএলএফএসএল) সাময়িক অবসায়ক (প্রবেশনাল লিক্যুইডেটর) মো. আসাদুজ্জামানকে ওই ১২২ ব্যক্তির বর্তমান ঠিকানা সরবরাহ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়।

পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং রাষ্ট্রকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দিতে বলা হয় তাকে।

spot_img

অন্যান্য সংবাদ