শনিবার, আগস্ট 6, 2022

হামিদ ফেব্রিকসের চমকঃ তিনদিনে পয়সা ডাবল

শাফিউন ইবনে শাহীনঃ হিন্দি সিনেমা হেরা ফেরি’র লক্ষ্মী চিট ফান্ড, যেখানে টাকা রাখলে ২৬ দিনে দ্বিগুন হয়ে যায়। অবশ্য এই কোম্পানির শেয়ারের দাম সেই সিনেমাকেও হার মানিয়েছে। এই কোম্পানির শেয়ারে টাকা দ্বিগুন হতে ২৬ দিনও লাগেনি। মাত্র তিন দিনেই বিনিয়োগের টাকা দ্বিগুন হয়েছে টেক্সটাইল খাতের কোম্পানি হামিদ ফেব্রিকসের শেয়ারে বিনিয়োগকারিদের। আলাদিনের চেরাগের মতো শেয়ারবাজারও যে রাতারাতি বড় লোক হওয়া যায়, সেই কল্পিত কথাই যেন সত্যি করে দিলো হামিদ ফেব্রিকস।

কোম্পানিটির শেয়ার দাম একদিনেই বেড়েছে ৬৭ শতাংশের ওপরে। আর তিন দিনে বেড়েছে প্রায় ৯৯ শতাংশ। লভ্যাংশ ঘোষণার সংবাদে বুধবার কোম্পানিটির শেয়ারের দামে এমন উলম্ফন ঘটেছে। গত মঙ্গলবার হামিদ ফেব্রিকসের পর্ষদ সভায় সমাপ্ত বছরের জন্য উদ্যোক্তা পরিচালকরা বাদে বাকি শেয়ারহোল্ডারদের ৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। অর্থাৎ কোম্পানিটির সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে ৫০ পয়সা করে পাবেন।

লোকসান দেয়ার পরেও লভ্যাংশ ঘোষণার সংবাদেই ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের হামিদ ফেব্রিকসের শেয়ার দাম এদিন প্রায় সাড়ে ১২ টাকা বেড়ে যায়। আগের দিন লেনদেন শেষে কোম্পানিটি শেয়ার দাম ছিল ১৮ টাকা ৩০ পয়সা। যা বুধবার লেনদেন শেষে দাঁড়ায় ৩০ টাকা ৬০ পয়সায়। তবে এদিন লেনদেনের এক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার দাম ৩১ টাকায়ও উঠে যায়। আর লেনদেনের শুরুতেই কোম্পানিটির শেয়ার দাম ছিল ১৯ টাকা ৩০ পয়সা। এর পরের ২ দিনে আরো ৫ টাকা বেড়ে ৩৬ টাকা ৩০ পয়সায় লেনদেন হয়। আর তাতেই পয়সা ডাবলের স্কিম সত্য হয়ে যায় এই শেয়ারের বিনিয়োগকারীদের জন্য।

“করোনার মহামারির কারনে এবার কোম্পানির ব্যবসায় লোকসানে আছে। লোকসানে থাকার পরেও সাধারণ বিনিয়োগকারিদের নগদ লভ্যাংশ দেয়ায় কোম্পানির প্রতি বিনিয়োগকারিরা আকৃষ্ট হয়েছে।”
-মিজানুর রহমান
কোম্পানি সচিব, হামিদ ফেব্রিকস লিমিটেড

তবে শেয়ার দামের এমন উলম্ফনকে মোটেও স্বাভাবিক বলছেন না বাজার বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টরা। তাদের ভাষ্য, ইতিহাসের সর্বনিম্ম লভ্যাংশ দিয়ে সর্বোচ্চ দামে লেনদেন হওয়া মোটেও স্বাভাবিক বিষয় নয়। এখন যারা শেয়ার কিনছেন তারা এই দামে কখনোই বিক্রি করতে পারবেন না। এই শেয়ারের অতিমূল্যায়িত হয়ে গেছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০১৪ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া কোম্পানিটি এত কম লভ্যাংশ এর আগে কখনোই দেয়নি। এর আগে কোম্পানিটি সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ নগদ ও ৫ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ থেকে শুরু করে সর্বনিম্ম ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে। এবারই প্রথম এতো কম লভ্যাংশ ঘোষণা করলো কোম্পানিটি। যার কারনে কোম্পানিটি এতো দিনের রেকর্ড ভেংগে এই প্রথম ‘বি’ ক্যাটাগরিতে লেনদেন হবে। এরপরও শেয়ারটি গত বুধবার তার সর্বকালের সর্বোচ্চ দামে লেনদেন হলো। হামিদ ফেব্রিকসের শেয়ার কখনো এর আগে এত বেশি দামে লেনদেন হয়নি।

হঠাৎ শেয়ারের এমন দাম বৃদ্ধির বিষয়ে জানতে চাইলে হামিদ ফেব্রিকসের কোম্পানি সচিব মিজানুর রহমান পুঁজিবাজার ডটকমকে বলেন, করোনার মহামারির কারনে এবার কোম্পানির ব্যবসায় লোকসানে আছে। লোকসানে থাকার পরেও সাধারণ বিনিয়োগকারিদের নগদ লভ্যাংশ দেয়ায় কোম্পানির প্রতি বিনিয়োগকারিরা আকৃষ্ট হয়েছে। এবার লোকসান হলেও কোভিড পরবর্তী সময়ে এই খাতের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। হয়তো এ কারনে বিনিয়োগকারিরা এই শেয়ারে আগ্রহ দেখাচ্ছে।

শেয়ারের দাম ৩৬ টাকা পর্যন্ত উঠে যাওয়াকে আপনারা স্বাভাবিক হিসেবে দেখছেন কি-না? এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ঘোষণার দিন তো শেয়ারের দামের লিমিট নেই। সেদিন যে কোনো কিছুই ঘটতে পারে। এরপর থেকে এখনও কেন বাড়ছে এই বিষয়ে আমি বলতে পারবো না।

হামিদ ফেব্রিকসের শেয়ার দামের উলম্ফনের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েল অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞ আবু আহমেদ বলেন, লভ্যাংশ ঘোষণার পরের দিন ওই কোম্পানির শেয়ারে কোন সার্কিট ব্রেকার থাকে না। লভ্যাংশের উপর ভিত্তি করে সেই শেয়ারের যে কোন দাম হতে পারে। তবে তা অবশ্যই যৌক্তিক হতে হবে। গত পরশু (বুধবার) কোম্পানিটির শেয়ার দাম বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এমন কোন যৌক্তিক কারন আমি দেখি না।

তিনি বলেন, মাত্র ৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেয়া লোকসানি কোম্পানির শেয়ারের দাম এতো বাড়া কোন স্বাভাবিক ঘটনা না। সার্কিট ব্রেকার না থাকার সুযোগে হয়তো কোন একটি গ্রুপ এই শেয়ারের দাম বাড়িয়ে নিয়েছে। এরকম শেয়ারের দাম বৃদ্ধি এর আগেও দেখা গেছে। যৌক্তিক কারনে না বাড়লে সেই দাম কিন্তু আর টেকে না বাজারে। তাই আমি বলবো দাম বাড়ার পরে এখন যারা এই কোম্পানির শেয়ার কিনতে চাচ্ছেন তাদের আরো সাবধান হওয়া উচিত।

অন্যদিকে ফ্রি ফ্লোট শেয়ার কম থাকার কারণে কোম্পানিটির শেয়ার দাম এমন বাড়তে পারছে বলে মনে করছেন কেউ কেউ। এ বিষয়ে ডিএসইর এক পরিচালক বলেন, করোনার কারনে এবার হামিদ ফেব্রিকসের ব্যবসা খারাপ হলেও পরবর্তীতে ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। এর বেশিরভাগ শেয়ারই পরিচালকদের হাতে। এর আগেও এই কোম্পানি থেকে বিনিয়োগকারীরা ভালো লভ্যাংশ পেয়েছেন। দীর্ঘমেয়াদি লাভের আশায় তাই এবার অনেকেই এই শেয়ার কিনেছেন। তবে তিনদিনে ৯৮ শতাংশ দাম বাড়া কিছুটা হলেও অস্বাভাবিক। সাধারণ বিনিয়োগকারিদের হাতে কোম্পানিটির শেয়া্রের পরিমান কম থাকায় এমনটা সম্ভব হয়েছে।

উল্লেখ্য, হামিদ ফেব্রিকসের সর্বশেষ প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২১ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত বছরের ১২ মাসে শেয়ার প্রতি লোকসান (ইপিএস) হয়েছে ১ টাকা ৭৬ পয়সা। শেয়ার প্রতি সম্পদমূল্য রয়েছে ৩৭ টাকা ৭৯ পয়সা। পরিচালন নগদ প্রবাহ হয়েছে ৩১ পয়সার।

৯১ কোটি ৫ লাখ ৭৩ হাজার টাকা পরিশোধিত মূলধনের এই কোম্পানিটির মোট শেয়ারের সংখ্যা ৯ কোটি ১০ লাখ ৫৭ হাজার ৩১২টি। এর মধ্যে ৫২ শতাংশ শেয়ারই রয়েছে কোম্পানিটির উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে। বাকি শেয়ারের মধ্যে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে আছে দশমিক ১৭ শতাংশ শেয়ার। আর প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ।

spot_img

অন্যান্য সংবাদ