শুক্রবার, জুন 24, 2022

এবার স্ত্রীকে নিয়ে হিরুর ডেল্টা লাইফের শেয়ারে কারসাজি

পুঁজিবাজার রিপোর্টঃ কারসাজির মাধ্যমে ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারের কৃত্তিমভাবে দাম বাড়িয়ে সাড়ে ৫১ কোটি টাকার বেশি হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে বিতর্কিত বিনিয়োগকারী আবুল খায়ের হিরু ও তার স্ত্রীসহ ৪ ব্যক্তি ও ১ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।

তাদের কারসাজির কারনে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবরের মধ্যে ডেল্টা লাইফের শেয়ারের দর প্রায় ৬৫ শতাংশ বাড়ে। ওই সময় তারা সিরিয়াল ট্রেডিং করে শেয়ারের দর ১৩৭ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ২২৬ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত বাড়িয়েছিলেন। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটি এন্ড এক্সচেঞ্জের কাছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) জমা দেয়া তদন্ত প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে।

কারসাজির অভিযোগে বাকি অভিযুক্তরা হলেন, কাজী সাদিয়া হোসেন, আবুল কালাম মাতবর, সাজেদ মাদবর ও ডিআইটি কো-অপারেটিভ লিমিটেড। হিরুর স্ত্রী কাজি সাদিয়া হাসান ডিআইটি বা দেশ আইডিয়াল ট্রাস্ট কো-অপারেটিভ সোসাইটি নামে সমবায় সমিতির ট্রেজারারের দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি একই সাথে সাকিব আল হাসানের মালিকানাধীন মোনার্ক হোল্ডিংসেরও এমডি। একই প্রতিষ্ঠানে পরিচালক হিসেবে রয়েছেন আবুল কালাম মাতবর।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ডেল্টা লাইফের শেয়ারে মূল্য বৃদ্ধিতে কারসাজির আলামত পাওয়া গেছে। কোম্পানিটির শেয়ার নিয়ে বড় ধরনের কারসাজি হয় মূলত গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবরের মধ্যে। ওই কয়েক দিনের মধ্যে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ৮৯ টাকা বৃদ্ধি পায়। ডিএসইতে গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ছিল ১৩৭ টাকা ৫০ পয়সা। ওই বছরের ২৬ অক্টোবর কোম্পানিটির শেয়ারের দাম বেড়ে দাঁড়ায় ২২৬ টাকা ৫০ পয়সায়। এ সময়ের মাঝে এসব বিনিয়োগকারী তাঁদের হাতে থাকা শেয়ার কেনা-বেচা করে বড় অঙ্কের মুনাফা তুলে নেন।

প্রতিবেদন অনুসারে, আবুল খায়ের হিরুর সহযোগীরা একসাথে মিলে কোম্পানিটির ৫৮.৭১ শতাংশ শেয়ার কেনা-বেচা করেছেন। ২৩টি ভিন্ন ভিন্ন বিও (বেনিফিশিয়ারি ওনার্স) হিসাব ব্যবহার করে কোম্পানিটির শেয়ার নিয়ে কারসাজির আশ্রয় নেন এসব বিনিয়োগকারী। এই কেনা-বেচার মাধ্যমে তারা সব মিলিয়ে ৫১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা লাভ করেছে।

ওই সময়ের মধ্যে তারা মূল মার্কেট ও ব্লক মার্কেট মিলিয়ে ২ কোটি ৪৮ লাখের বেশি শেয়ার কেনেন এবং ২ কোটি ৩০ লাখের মত শেয়ার বিক্রি করেন।

তদন্তে দেখা গেছে, হিরু ও তার সহযোগীরা ২০২১ সালের ২২ সেপ্টেম্বরের ১১টা ৩৫ মিনিট থেকে ১১টা ৪০ মিনিটের মধ্যে ওইদিনের ৭২.৫০ শতাংশ শেয়ার কিনে ফেলেন। ওইদিন মোট ৬৬৫টি হাওলা সম্পন্ন হয় যার মধ্যে হিরু ও সহযোগিরা মিলে একারাই এই ৫ মিনিটের মধ্যে ৪২৭টি অর্ডার সম্পন্ন করে। তাদের এই আগ্রাসি ক্রয়ে শেয়ারের দাম ১৫৯ টাকা ৭০ পয়সা থেকে বেড়ে ১৭৪ টাকা ৪০ পয়সায় গিয়ে থামে।

তদন্ত কমিটি নিশ্চিত হয়েছে, এসব বিনিয়োগকারিরা সক্রিয়ভাবে কারসাজি করে ওইদিন কৃত্তিমভাবে শেয়ারের দাম বাড়ানোর চেষ্ঠা করেছে। এতে করে ওইদিন শেয়ারটির দাম আগের দিনের চাইতে ৭.৮২ শতাংশ বা ১২ টাকা ৪০ পয়সা বেড়েই লেনদেন শেষ হয়।

তদন্ত কমিটি আবুল খায়েরের সহযোগীদের আইন ভংগের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছে, তারা এমন কিছু লেনদেন করেছেন, যা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯ এর ১৭(ই) ধারার স্পষ্ট লঙ্ঘন। এই বিনিয়োগকারীরা শেয়ারটি কেনাবেচার সময়ে বাজারে মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন। সিকিউরিটিজ আইন অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানির ১০ শতাংশ বা তার বেশি শেয়ার কিনতে হলে স্টক এক্সচেঞ্জ, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও কোম্পানিকে জানাতে হয়। কিন্তু এ বিনিয়োগকারীরা তার কিছুই করেননি।

ডিএসইর তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আবুল খায়ের হিরু ও তার সহযোগীরা সিরিজ লেনদেনের মাধ্যমে শেয়ারটির দাম বাড়িয়েছেন, যা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯ এর লঙ্ঘন। মূলত কারসাজির উদ্দেশ্যে বিপুল শেয়ার কিনে প্রথমে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়। এতে করে ওই শেয়ারের দাম বাড়তে থাকে। শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধির একপর্যায়ে উল্লেখিত বিনিয়োগকারীরা তাঁদের শেয়ার বিক্রি করে দিয়ে মুনাফা তুলে নেন।

ডিএসইর তদন্তে কারসাজির তথ্য প্রমাণ পাওয়ার পর এখন বিএসইসির দুই কর্মকর্তাকে এ কারসাজি ঘটনা তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্ত কমিটিকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে তাঁদের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়। কমিটিকে কারসাজির পাশাপাশি বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহেরও নির্দেশ দেওয়া হয়।

অবশ্য এরই মধ্যে নিয়ন্ত্রক সংস্থা গত ১৪ এপ্রিল আবুল খায়ের হিরু ও তার সহযোগীদের অস্বাভাবিক শেয়ার কেনাবেচার প্রেক্ষিতে কারন দর্শানোর নোটিস দিয়েছে।

বর্তমানে সমবায় অধিদপ্তরের উপনিবন্ধক (ইপি) হিসেবে কর্মরত আবুল খায়ের হিরুর কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি নোটিস পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। এসময় কারসাজির বিষয়টি অস্বীকার করে এর বাইরে তিনি বিস্তারিত আর কিছু বলতে চাননি।

 

একই শামুকে এর আগেও পা কেটেছে

এর আগেও একই কোম্পানির শেয়ারে কারসাজির অভিযোগ ওঠে হিরুর বিরুদ্ধে। আবুল খায়ের হিরু স্বীকার করেছিলেন, ২৭ ও ২৮ জুন তিনি ডেল্টা লাইফের শেয়ার কিনেছেন। দুইদিনই সার্কিট ব্রেকারের সর্বোচ্চ দরে নিজেই কিনেছেন ৩৫ লাখ শেয়ার। এর বাইরে তার এক ‘ক্লায়েন্ট’ শেয়ার কিনেছেন বলেও জানান তিনি।

পরে জানা যায়, আলোচিত এ শেয়ার কেনাবেচায় ক্লায়েন্ট বা ক্রেতা হিসেবে ছিলেন দেশসেরা ক্রিকেট তারকা সাকিব আল হাসান। এতে করে শেয়ার কেলেংকারিতে নাম জড়িয়ে যায় দেশের জনপ্রিয় ক্রিকেট তারকারও।

ওই দিন শেয়ারে বিক্রেতা ছিল রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিনিয়োগ সংস্থা আইসিবি। এ ঘটনায় বিএসইসির পক্ষ থেকে সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তার ওইদিনের লেনদেনসহ অতীতের লেনদেনগুলো পরীক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ভবিষ্যতেও তার লেনদেন পর্যবেক্ষণে রাখতে বলা হয়েছে।

একই সাথে ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের অস্বাভাবিক শেয়ার কেনাবেচা খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। সংস্থার নির্বাহী পরিচালক আনোয়ারুল ইসলামকে প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটি করা হয়।

 

ডেল্টা লাইফও বিতর্কিত

ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি নিজেও হিরুর মতই বিতর্কিত। সাধারণ বীমা পলিসি গ্রাহকদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করার অভিযোগে গত বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের পর্ষদ ভেঙে দিয়ে আইডিআরএর সাবেক সদস্য সুলতান-উল-আবেদীন মোল্লাকে কোম্পানিটির প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয় আইডিআরএ। সেদিন বিকালেই পুলিশের সহায়তায় কোম্পানিটির কার্যালয়ে গিয়ে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

তবে দায়িত্ব নেয়ার চার মাসের মধ্যেই তার ওপর আস্থা হারিয়ে ডেল্টা লাইফের পরামর্শকের দায়িত্বে থাকা সাবেক যুগ্ম সচিব মো. রফিকুল ইসলামকে কোম্পানিটির নতুন প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয় বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। দায়িত্ব নেয়ার চার মাসের মাথায় ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে তিনিও পদত্যাগ করেন।

তার জায়গায় আইডিআরএর সাবেক সদস্য মো. কুদ্দুস খানকে সর্বশেষ কোম্পানিটির প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।

যা গত বৃহষ্পতিবার (১৯ মে) সর্বশেষ লেনদেন হয়েছে ১১২ টাকা ৫০ পয়সায়। অর্থাৎ অক্টোবরে ২২৬ টাকা ৫০ পয়সা দরে যে সব বিনিয়োগকারীরা শেয়ারটি কিনেছিলেন, এখন তাদের শেয়ার প্রতি লোকসান হয়েছে ১১৪ টাকা করে। পুঁজির অর্ধেকই হারিয়েছেন তাঁরা।

উল্লেখ্য, ডেল্টা লাইফের শেয়ারের দর গত এক বছরের মধ্যে ৭৭ টাকা থেকে ২৩৯ টাকার মধ্যে ওঠানামা করেছে।

spot_img

অন্যান্য সংবাদ