বৃহস্পতিবার, মে ২৬, ২০২২

‘বাজার যেন ছাগল একটা’

শাফিউন ইবনে শাহীনঃ বাজারের স্বাভাবিক গতি ফেরাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেয়া প্রতিটি পদক্ষেপই যেন ব্যর্থ হচ্ছে। কোন ভাবেই ফেরানো যাচ্ছে না উলটো রথ। বাজার সম্পর্কে যা বলা হচ্ছে তার কোন মিলই পাওয়া যাচ্ছে না সূচকে কিংবা লেনদেনে। আর এতেই চটেছেন সাধারন বিনিয়োগকারিরা। তাদের ক্ষোভ উগড়ে পড়ছে ব্রোকারেজ হাউজের রুম থেকে সোস্যাল মিডিয়াতে পর্যন্ত। এমনই একজন বিনিয়োগকারি ফেসবুকে বাজারকে তুলনা দিয়েছেন দড়িতে বাধা ছাগলের সাথে। তার মতে, ‘বাজার এখন যেন অনেকটা দড়িতে বাধা ছাগলের মতো আচরণ করছে। ছাগলের দড়ি ধরে যেদিকে টানা হয় ছাগল সবসময় যেতে চায় তার উলটো দিকে। সংশ্লিষ্টদের বাজার নিয়ে টানাটানি আর তাদের দিক থেকে বাজারের উলটো দিকে দৌড় দেখলে দড়িতে বাধা ছাগলের সাথে অনেকটাই মিল পাওয়া যায়।’

নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেয়া একের পর এক পদক্ষেপ বাজারে এসে যেন আসলেই বিদ্রোহ ঘোষণা করে। বাজারসংশ্লিষ্টরা বলে এক আর পরে বাজারে এসে দেখা যায় আরেক। কোন ব্যবস্থাতেই বাজারের স্বাভাবিক অবস্থা ফেরানো যাচ্ছে না। এতে বিনিয়োগকারিদের হতাশা যেমন বাড়ছে তেমনি চিন্তার বলি রেখা দীর্ঘ হচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থারও।

সেই দুশ্চিন্তার বড় কারন এখন সূচক এবং লেনদেন দুটোতেই। ধরে-বেধেও সূচকের পতন ঠেকানো যাচ্ছে না। সাথে প্রতিদিনই কমছে লেনদেন। এ নিয়ে রোজায় পর পর তিন কর্মদিবসে সূচকের পাশাপাশি কমল লেনদেনও।

অথচ রোজার আগে রেকর্ড-ব্রেকিং লেনদনের ঘোষণা এসেছিল পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছ থেকে। ৩০ মার্চের বৈঠকে বিএসইসির পক্ষ থেকে বলা হয়, রমজান মাসে স্টক ব্রোকার ও ট্রেকহোল্ডাররা প্রতিটি ডিলার অ্যাকাউন্টে কমপক্ষে এক কোটি টাকা করে বিনিয়োগ করবে। একই সঙ্গে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো নিজস্ব পোর্টফোলিওর মাধ্যমে নতুন করে ২০০ থেকে ৩০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়াও শেয়ারবাজার স্থিতিশীলতা তহবিল থেকে ১০০ কোটি টাকা আইসিবির মাধ্যমে বিনিয়োগের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

৩০ মার্চের বৈঠকে বাজার মধ্যস্থতাকারিরা যেভাবে বিনিয়োগের অংক নিজেদের মধ্যে ভাগ-ভাটোয়ারা করে নিলেন তাতে সাধারণ বিনিয়োগকারিরা আশা করেছিলেন এবার মনে হয় বাজার ঘুরে দাঁড়াবে। তবে তাদের সে আশায় গুড়ে বালি। বাজারে নতুন ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ আসা তো দূরের কথা এখন রোজ ৫০০ কোটি টাকা লেনদেনই ছাড়াতে পারছে না বাজার। এমনকি আজ সপ্তাহের চতুর্থ কার্যদিবসে তো লেনদেন ৫০০ কোটি ছাড়ানোর আগেই দম ছেড়ে দিয়েছে।

ধারাবাহিকভাবে লেনদেন কমতে কমতে বুধবার ডিএসইতে লেনদেন হয়েছে ৪৯০ কোটি ৫০ লাখ টাকা। গত বছরের ১১ এপ্রিলের পর ডিএসইতে আর এতো কম লেনদেন হয়নি। গত বছরের ১১ এপ্রিল ডিএসইতে লেনদেন হয় ৪৫৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। প্রতিদিন শতাধিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের ক্রেতার ঘর শূন্য পড়ে থাকছে। এই ক্রেতা সংকটেই মূলত লেনদেনও ধারাবাহিকভাবে কমছে।

এ অবস্থায় বাজারের সাধারণ বিনিয়োগকারিদের হতাশার সাথে সাথে বাড়ছে অনিশ্চয়তা। বাজার কেন এমন আচরণ করছে তার যৌক্তিক ব্যাখ্যা খুজছেন সবাই। দরপতনের সীমা ২ শতাংশ বেঁধে দেয়াকে অনেকেই লেনদেন কমার কারন বলে উল্লেখ করছেন।

তাদের মতে, পুঁজিবাজারে সূচকের বড় পতন ঠেকানোর ‘টোটকা’আসলে অনেকটা ব্যাক ফায়ার করেছে। মন্দা বাজারে শেয়ারদর ২ শতাংশ কমে যাওয়ার পর বিনিয়োগকারীদের মনে ধারণা জন্ম হচ্ছে দর আরও কমে যাবে। ফলে এই দামে ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না। এতে লোকসান দিয়েও শেয়ার থেকে বের হয়ে যাওয়ার সুযোগ মিলছে না।

আবার ২ শতাংশ কমে পতন কবে থামবে- এটা দেখার জন্য শেয়ারের ক্রেতা না আসায় চাহিদা তৈরি হচ্ছে না। এতে আবার সেই শেয়ারের দর বৃদ্ধির সুযোগও তৈরি হচ্ছে না- বলছেন পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে দরপতনের কারণে কিছু শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের টাকা আটকে গেছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ নিয়মিত লেনদেনে অংশ নিতে পারছে না। এসব কারণে লেনদেন কমে গেছে।

আবার অনেকের মতে, বাজারে মূলত প্রাতিষ্ঠানিকদের অনেকগুলো গ্রুপ তৈরী হয়েছে। এদের কেউ কেউ চায় না এখনই বাজারে উত্থান হোক, দাম আরও পড়ার পরে তারা তাদের বিনিয়োগ বাড়াবে। সেই দাম পড়ার পালে হাওয়া দিতে নিজেদের হাতে থাকা শেয়ারও তারা কম দামে ছাড়ার চেষ্টা করছেন। এতে শেয়ার বিক্রির ঘরে বসছে ঠিকই কিন্তু কিন্তু ২ শতাংশের সীমার ফেরে ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না। যার কারনে শেয়ারে বিক্রি না করেই একটা ওই শেয়ারে অস্থিরতা তৈরি করতে পারছেন তারা। আর এ কৌশলে কাংখিত দামে নামিয়ে আনতে পারলেই তারা বিনিয়োগ বাড়ানো শুরু করবেন।

বড় বিনিয়োগকারীদের আরেকটি গ্রুপ পতনের বাজারে স্রেফ পর্যবেক্ষকের ভুমিকা পালন করছেন। তাদের নিষ্ক্রিয়তার কারণে ব্যক্তি শ্রেণির বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে দিশা পাচ্ছেন না। ক্রমাগত দরপতনে তারা লোকসানে পড়ে নতুন করে বিনিয়োগের ক্ষমতা হারাচ্ছেন। যা সার্বিক শেয়ারবাজারের নেতিবাচক ধারাকে উস্কে দিচ্ছে।

তবে উপরের যে কারনেই হোক, বাজারে টানা দরপতন আর লেনদেনে খরা দেখা দিয়েছে দেশের শেয়ারবাজারে এটাই সত্যি। সাধারণ বিনিয়োগকারিদের মধ্যের অস্থিরতা কমাতে বাজার সংশ্লিষ্টরা খুব দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ নিবেন এটাই সবার প্রত্যাশা।

এদিকে আজ বুধবার (৬ এপ্রিল) প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সবকয়টি মূল্যসূচকের পতন হয়েছে। এর মাধ্যমে টানা তিন কার্যদিবস পতনের মধ্যে থাকলো শেয়ারবাজার।

ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ৩১ পয়েন্ট কমে ছয় হাজার ৬৬২ পয়েন্টে নেমে গেছে। এর মাধ্যমে টানা তিনদিনের পতনে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক কমলো ১০৯ পয়েন্ট। অপর দুই সূচকের মধ্যে বাছাই করা ভালো কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক ৫ পয়েন্ট কমে দুই হাজার ৪৫৯ পয়েন্টে অবস্থান করছে। আর ডিএসই শরিয়াহ্ আগের দিনের তুলনায় ৪ পয়েন্ট কমে এক হাজার ৪৫৬ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।

বাজারটিতে দাম বাড়ার তালিকায় নাম লিখিয়েছে মাত্র ৪৪টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট। বিপরীতে দাম কমেছে ২৯৩টি। আর ৩৮টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। দাম কমার তালিকায় স্থান করে নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ৮৪টির শেয়ার দিনের সর্বনিম্ন দামে পৌঁছে যায়। এরপরও লেনদেনের এক পর্যায়ে এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের ক্রয় আদেশের ঘর শূন্য হয়ে পড়ে।

লেনদেন খরার বাজারে ডিএসইতে টাকার অঙ্কে সব থেকে বেশি লেনদেন হয়েছে লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের শেয়ার। কোম্পানিটির ৪০ কোটি ৬২ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছ। দ্বিতীয় স্থানে থাকা বেক্সিমকোর ৪০ কোটি ৮ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। ১৫ কোটি ৫২ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেনের মাধ্যমে তৃতীয় স্থানে রয়েছে কাট্টালী টেক্সটাইল।

এছাড়া ডিএসইতে লেনদেনের দিক থেকে শীর্ষ দশ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে- বাংলাদেশ বিল্ডিং সিস্টেম, বিবিএস কেবলস, সি পার্ল বিচ রিসোর্ট, ওরিয়ন ফার্মা, ভিএফএস থ্রেড ডাইং, মোজাফ্ফর হোসেন স্পিনিং মিলস এবং নাহি অ্যালুমেনিয়াম।

অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই কমেছে ৭৯ পয়েন্ট। বাজারটিতে লেনদেন হয়েছে ২২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। লেনদেনে অংশ নেওয়া ২৭৩টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৫৭টির দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ১৯৬টির এবং ২০টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।

spot_img

অন্যান্য সংবাদ