মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর 27, 2022

না বুঝে শেয়ার ব্যবসা পঞ্জি স্কিমের মতো, পুঁজি হারাতেই হবেঃ আরিফ খান

পুঁজিবাজার রিপোর্টঃ বিনিয়োগ শিক্ষা ছাড়া পুঁজিবাজারে ব্যবসা করাকে পঞ্জি স্কিমের সাথে তুলনা করেছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক কমিশনার আরিফ খান। তিনি বলেন, যেসব সাধারণ বিনিয়োগকারি না বুঝে এ বাজারে আসে তাদের ৯৫ শতাংশ পুঁজি হারাতে বাধ্য হয়। বাজারের গুজব শুনে, অন্যকে অনুসরন করে হয়তো মুনাফা করা যায় কিন্তু সেই মুনাফা শেষ পর্যন্ত ঘরে তোলা যায় না। ভয় এবং লোভ যদি কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে তার এ বাজারে আসা উচিত না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সোমবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর একটি হোটেলে ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরাম (সিএমজেএফ) এবং বাংলাদেশ একাডেমি ফর সিকিউরিটি মার্কেটের (বিএএসএম) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘পুঁজিবাজারে মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির প্রভাব’ শীর্ষক কর্মশালায় প্যানেল আলোচকের বক্তব্যে বিএসইসির সাবেক কমিশনার এসব কথা বলেন। এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কমিশনার ড. শেখ সামসুদ্দিন আহমেদ এবং প্যানেল আলোচক হিসেবে ছিলেন অধ্যাপক আবু আহমেদ, অধ্যাপক মোহাম্মাদ হেলাল উদ্দিন, বিআইবিএমের শাহ মোহা আহসান হাবীব ও সিএমজেএফ সভাপতি জিয়াউর রহমান। সভাপতিত্ব করেন বিএএসএমের মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী।

যারা শেয়ার ব্যবসা ঠিক মতো বোঝেন না , তাদেরকে বিনিয়োগের জন্য অ্যাসেট ম্যানেজারদের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেন আরিফ খান। এছাড়াও ফান্ড ম্যানেজারদের নিয়ে সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, এই খাতের অ্যাসেট ম্যানেজারদের নিয়ে সমালোচনা থাকলেও সবাই খারাপ না। টুকটাক সব খাতেই খারাপ লোকজন আছে। তাই ভালো ফান্ড ম্যানেজারদের মাধ্যমে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের পরামর্শ দেন তিনি। এক্ষেত্রে ফান্ড ম্যানেজারদের বিগত কয়েক বছরের ইতিহাস দেখে বাছাই করলে বিনিয়োগ নিশ্চিন্ত থাকার কথা জানান তিনি।

মার্কেটে সাধারণ বিনিয়োগকারিদের তুলনায় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা অপ্রতুল মন্তব্য করে তিনি বলেন, আমাদের দেশে আরও বেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারির দরকার ছিলো। সাধারণ বিনিয়োগকারিদের চাইতে বিনিয়োগ সম্পর্কে জ্ঞান তাদের বেশি থাকে। এতে গুজব নির্ভর হয়ে বাজার ওঠানামার সুযোগ কম থাকে। এসময় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারিদের ঘাটতির ব্যপারকে কাঠামোগত সমস্যা বলে মন্তব্য করেন তিনি।

দেশের পুঁজিবাজারের আরও বিকশিত হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করে সাবেক এ কমিশনার বলেন, গত অর্থবছরে পুঁজিবাজার থেকে কোম্পানিগুলো মাত্র ১২শ কোটি টাকা বিনিয়োগ নিয়েছে, যেখানে মতিঝিলের যেকোন ব্যাংকের শাখা নুন্যতম ৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে। পুঁজিবাজারের জন্য রাজস্ব নীতিতে আরও বেশি সুযোগ দিলে কোম্পানিগুলো আসতে উদ্বুদ্ধ হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

কর্মশালার শিরোনামের দিকে ইংগিত করে আরিফ খান বলেন, একটি দেশের অর্থনীতি যদি ছাদ হয় তবে মূদ্রানীতি, রাজস্বনীতি ও পুঁজিবাজার প্রত্যেকেই একেকটি পিলার। এর কোন একটা ঠিক মতো কাজ না করলে বাকিগুলোও কাজ করে না।

অনেক নিয়ন্ত্রক সংস্থাই এটি বুঝতে চায় না উল্লেখ করে বলেন, আমাদের দেশের কোন কোন রেগুলেটর মনে করে পুঁজিবাজার তাদের অংশ না। এই ধারনা ঠিক না। অনেকেই তাদের কর্মপরিধিতে এ বিষয়টি এড়িয়ে যায়। তাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতাও রয়েছে। এটা পাল্টাতে হবে। কারন মানিটরি পলিসির সঙ্গে পুঁজিবাজার সরাসরি জড়িত। একটি দেশের পুঁজিবাজার যত বড় তার অর্থনীতিও তত বড়। এটি যত তাড়াতাড়ি সবার বোধগম্য হবে ততই দ্রুত মংগল হবে।
গত দু’দিনের সূচকের পতন সম্পর্কে বলতে গিয়ে সাবেক এ কমিশনার বলেন, অনেকে মূল্যসূচক কমে গেলে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে দোষারোপ করে। অথচ সূচক নিয়ন্ত্রণ করা রেগুলেটরের কাজ না। সূচকের নিজস্ব গতিতে ওঠানামা করবে, এটাই স্বাভাবিক। কোন বাজারেই টানা সূচকের উত্থান হয় না।

ভালো কোম্পানি পুঁজিবাজারে না আসার পেছনে কারন হিসেবে বিএসইসির এই সাবেক কমিশনার বলেন, দেশে বিদ্যমান রাজস্ব ব্যবস্থার সঠিক নজরদারির অভাবে কোন ভালো কোম্পানি পুঁজিবাজাররে আসতে চায় না। একটি অতালিকাভুক্ত কোম্পানি চাইলেই ভ্যাট-ট্যাক্স ফাঁকি দিতে পারে। তার কাছে তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির ৭.৫% কর হার ব্যবধান কোন মানেই রাখে না। কারন সে তো পুরোটাই ফাঁকি দেয়। তবে একটি ভালো কোম্পানি যদি শেয়ারবাজারে আসতে চায়, তাহলে তাকে সঠিক ভ্যাট-ট্যাক্স দিতে হবে। ফলে প্রতিযোগি কোম্পানিগুলোর চাইতে তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে না চাইতেও বেশি দরে পণ্য বিক্রি করতে হবে। এতে তালিকাভুক্ত কোম্পানি প্রতিযোগিতায় বাজার থেকে হারিয়ে যাবে।

এছাড়াও আর্থিক হিসাবে স্বচ্ছতার অভাবও বিনিয়োগে বাধা বলে জানান তিনি। তার মতে আর্থিক হিসাবে অস্বচ্ছতার কারনে বিনিয়োগকারীদের প্রতারণার স্বীকার হতে হয়। এই পরিস্থিতি কাটিয়ে তুলতে প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া কোম্পানিদের ম্যানেজমেন্ট ও সিএফওকে সঠিক শাস্তি দিতে পারলে, অন্য সবাই ঠিক হয়ে যাবে বলে মনে করেন তিনি।

spot_img

অন্যান্য সংবাদ