বুধবার, সেপ্টেম্বর 28, 2022

আপনারা যাদের চাচ্ছেন, তারা আসতে শুরু করেছেঃ এসইসি চেয়ারম্যান

পুঁজিবাজার রিপোর্টঃ পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানি আসছে না বিষয়টি সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল- ইসলাম। তিনি বলেন, চলতি বছরই ভালো ভালো কিছু কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসবে। আমরা যা জানি, তা হয়তো সব সময় আপনাদের জানানো সম্ভব হয়না। আমরা ভালো কোম্পানি আনতে কাজ করে যাচ্ছি। খুব শিগগিরই তিনটি বড় কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসবে। আপনারা যাদের চাচ্ছেন, তারা আস্তে আস্তে আসতে শুরু করেছে। আগামী প্রান্তিক থেকেই আপনারা দেখতে শুরু করবেন । ভালো, সুস্থ একটা পরিবেশ যখন পাওয়া যাবে, তখন অন্যরাও উৎসাহিত হবে।’

রোববার রাজধানীর একটি হোটেলে ‘শেয়ারবাজারে ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তির প্রতিবন্ধকতা ও সমাধানের উপায়’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। বিজনেস আওয়ার টোয়েন্টিফোর ডটকম এই সেমিনারের আয়োজন করে। এ সময় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী, দি ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টেন্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএমএবি) প্রেসিডেন্ট মো. মামুনুর রশীদ ও বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) প্রেসিডেন্ট মো. ছায়েদুর রহমান।

বিএসইসি চেয়ারম্যান আরও বলেন, আইপিও বাণিজ্য, প্লেসমেন্ট বাণিজ্য এগুলো দেশে বহু হয়েছে। এখন আমরা এটাকে মোটামুটি একটা অবস্থানে নিয়ে আসছি। কেউ আইপিও বাণিজ্য করে বিনিয়োগকারীদের ঠকিয়ে টাকা নিয়ে চলে যাবে এটা এখন আর হবে না। কোনো অডিটর ভুল রিপোর্ট দিতে আর সাহস পায় না। যেসব চাটার্ড একাউন্টেন্ট এসব অপকর্মে লিপ্ত থাকে তাদের বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।

কোম্পানির পরিচালকদের শেয়ার ধারনের ব্যাপারে তিনি বলেন, অনেকে বলেন সম্মিলিতভাবে ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণের বিষয়টি ঠিক না। কিন্তু আমরা এ বিষয়ে একমত না। শেয়ার ধারণের ক্ষেত্রে আমরা অটল। ৩০ শতাংশ থাকতেই হবে, না থাকলে ৭০ শতাংশ যারা আছে তারা তো জড়িত না। তাদের স্বার্থ রক্ষা কীভাবে হবে? আমাদের সবার স্বার্থ দেখতে হবে। একদিক দেখলে তো হয় না।

তিনি আরও বলেন, আপনি একটি কোম্পানির পরিচালক হবেন, কোম্পানি চালাবেন কিন্তু দুই শতাংশ শেয়ার রাখবেন না, এটা কেমন কথা। তাহলে আপনার ইন্টারেস্ট কী? খালি বেতন-ভাতা নেওয়া ও সুবিধা নেওয়া? আপনি যদি সেটার পার্ট না হন, তাহলে অন্যদের স্বার্থ রক্ষা করবেন কীভাবে? দুই শতাংশ শেয়ার ধারন, সেটা করতেই হবে।

এ সময় ব্যাংক খাতের ঋণ পদ্ধতি নিয়েও কথা বলেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ক্লাসিফিকেশন লোনটা আমাদের দেশের জন্য ব্যবসাবান্ধব না। ব্যবসা করতে সবাই তো আর নিয়ত খারাপ করে আসে না। ব্যবসায় লাভ-ক্ষতি আছে। কিন্তু সে আর পারে না। তখন সে নিজেও বিপদে পড়ে, ব্যাংককেও বিপদে ফেলে। আলটিমেটলি ক্লাসিফিকেশন লোনের কারণে তার জেল, জরিমানা, ব্যবসা বন্ধ, সবাইকে নিয়ে সমস্যায় পড়া এগুলোই হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, হয়তো আমি একটা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত আছি, যেটার সঙ্গে আমার ম্যানেজমেন্টের কোনো সম্পর্ক নেই, আমি হয়তো একজন পরিচালক। সেই প্রতিষ্ঠান ক্লাসিফাইড হলে আমার ভালো ১০টা প্রতিষ্ঠান লাভজনক, সেগুলোও কিন্তু ক্লাসিফাইড। এসব কারণে দেশের মানিমার্কেটে বড় ধরনের একটা অরাজকাত হয়ে… নিজেরাও বিপদে পড়েছে, ব্যাংকিং সিস্টেমকেও বিপদে ফেলেছে। আমাদের অনেক আগেই বিনিয়োগকারীদের এ ব্যাপারে সচেতন করা উচিত ছিল।

বড় কোম্পানিগুলোকে চাপ দিয়ে পুঁজিবাজারে আনা প্রসংগে তিনি বলে, কোন কোম্পানিকে জোর করে পুঁজিবাজারে আনা ঠিক হবেনা। তাদেরকে বুঝিয়ে এখানে আনতে হবে। কোম্পানিগুলোকে এখানে আসতে মূলধন বেধে দিয়ে জোর প্রয়োগ করা ঠিক হবেনা। বরং তাদেরকে পুঁজিবাজারের ভালো দিকগুলো নিয়ে বুঝিয়ে আনতে হবে। আমরা সেই চেষ্টাটাই করেছি।

ক্ষুদ্র কুটির ও মাঝারি শিল্পের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা এসএমই সেক্টরে এতদিন গুরুত্ব দিতাম না। ৫০ বছর আগে যদি আমার এসএমই খাতকে গুরুত্ব দিতাম, তাহলে প্রতিষ্ঠানগুলো মিডিয়াম থেকে লার্জ হতো। এখন আমরা এসএমই’র জন্য আলাদা একটা প্লাটফর্ম করে দিয়েছি। এখানে লিস্টিং হওয়ার মাধ্যমে তারা কর্পোরেট আচার-আচারন শিখতে পারছে। পরবর্তীতে ভালো ফলাফল দেখিয়ে এখান থেকেই তারা মূল মার্কেটে আসতে পারবে। আমরা এখই তাদেরকে এই সুযোগটা দিচ্ছি।
তিনি বলেন, আমাদের দেশে বর্তমানে যে জনসংখ্যা, এখানে কর্মসংস্থান হচ্ছে আমাদের একমাত্র অগ্রাধিকার। ব্যবসা-বাণিজ্যে কিন্তু ভালোও হবে লসও হবে। লাভ-লস যাই হোক সেটা আমাদের দেশেই থাকে। কারো লাভ, কারো লস। কিন্তু কর্মসংস্থান সব থেকে বেশি জরুরি। এটার জন্য আমাদের এখন সিএমএসএমই-কে (কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প) এখন সব থেকে বেশি গুরুত্ব দিতে হচ্ছে।

বিজনেস আওয়ার টোয়েন্টিফোর ডটকমের উপদেষ্টা আকতার হোসেন সান্নামাতের সভাপতিত্বে এবং সম্পাদক ও প্রকাশক আমিরুল ইসলাম নয়নের সঞ্চলনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী এবং বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সভাপতি মুহাম্মদ ছায়েদুর রহমান।

ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, আমাদের দেশের অর্থনীতির সঙ্গে পুঁজিবাজারের কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। ১৯৯৬ বা ২০১০ সালে যখন পুঁজিবাজারে ধস হয় তখন আমাদের অর্থনীতি কিন্তু খারাপ ছিল না। আবার পুঁজিবাজারে যখন উত্থান হয়েছে তখন যে দেশের অর্থনীতিতে অনেক পরিবর্তন এসেছে তেমনও নয়।
তিনি বলেন, আমরা অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছি কিন্তু পুঁজিবাজারে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি বললেই চলে। গত কয়েক বছর যেসব কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে সেগুলোর মধ্যে ভালো কোম্পানি কম। অথচ পুঁজিবাজারের বর্তমান যে অবস্থা, বাজারের মূল সমস্যাই হলো আপনি কোথায় ইনভেস্ট করবেন। ইনভেস্ট করার মতো কোম্পানিতো সামান্য কিছু। ভালো ইন্ডাস্ট্রিগুলো ভালো ব্যবসাগুলো লিস্টিং থেকে দূরে আছে।
ভালো কোম্পানি পুঁজিবাজারে না আসার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ব্যাংক থেকে এখনো পর্যন্ত খুব সহজে ঋণ পাওয়া যায়। একটা ভালো কোম্পানিকে ঋণ দেওয়ার জন্য অনেক ব্যাংক মুখিয়ে থাকে। যতদিন ব্যাংকের অতিরিক্ত তারল্য থাকবে এবং ব্যাংক থেকে সহজে ঋণ পাওয়া যাবে, ততদিন ভালো কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসতে চাইবে না।

বিএমবিএ প্রেসিডেন্ট ছায়েদুর রহমান তার বক্তব্যে বলেন, বিশেষ সুযোগ সুবিধা দেয়া ছাড়া কোন সেক্টরের উন্নয়ন সম্ভব না। কেউ যদি তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠিত করে ফেলে, তারপর কেন সে তার প্রতিষ্ঠানে বাহির থেকে অংশীদার নিবেন। যদি ভালো কোম্পানিকে পুঁজিবাবাজারে আনতে হয়, তাহলে অবশ্যই তাকে ভালো সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে।

ভালো কোম্পানির বাজারে আসার জন্য আলাদা সুবিধার দাবি করে তিনি বলেন, আমাদের দেশে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে ৪০ শতাংশেরও বেশি এসেছে ফিন্যান্সিয়াল প্রতিষ্ঠান। তারা যে সেচ্ছায় এখানে এসেছে তাও নয়, তারা আইনের বাধ্য বাধকতার কারণে এসেছে। কিন্তু ভালো কোম্পানি আসার জন্য তো আইনের বাধ্য বাধকতা নেই। তাই ওই সমস্ত কোম্পানিগুলোকে মার্কেটে আনতে হলে তাদের জন্য ভালো সুযোগ-সুবিধা রেখে আইনের সংশোধন আনা উচিত।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন দ্য ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টেন্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএমএবি) প্রেসিডেন্ট মো. মামুনুর রশীদ।

তিনি বলেন, গত ১০ বছর দেশের অর্থনীতি ৬ শতাংশের বেশি হারে বেড়েছে এবং নিয়মিত মাথাপিছু আয় বেড়েছে। এতে আমাদের জিডিপি পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে উঠে এসেছে। এই উন্নতির মধ্যেও আমরা শেয়ারবাজারে পিছিয়ে রয়েছি। এর পেছনে শেয়ারবাজারে আসার থেকে না আসা কোম্পানির প্রকৃত অর্থে রাজস্ব সুবিধা বেশি হওয়া অন্যতম কারণ। এই সমস্যা কাটিয়ে তুলতে অতালিকাভুক্ত কোম্পানির রাজস্ব ফাঁকির রাস্তা বন্ধ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের প্রধান উৎস শেয়ারবাজার হলেও বাংলাদেশ এক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে। যা ২০২০ সালে বাংলাদেশে মোট অর্থায়নের মাত্র দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ শেয়ারবাজার থেকে অর্থায়নের তথ্যে খুব ভালো করেই উপলব্ধি করা যায়। যেখানে ৯৯ দশমিক ৯৩ অর্থায়ন করা হয়েছে ব্যাংক থেকে। ওই বছরে মোট অর্থায়নের মধ্যে ব্যাংক থেকে ১০ লাখ ৯৪ হাজার ৭ কোটি টাকা ও শেয়ারবাজার থেকে ৭৬৮ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল।

spot_img

অন্যান্য সংবাদ