সোমবার, সেপ্টেম্বর 26, 2022

জালিয়াতি বন্ধে অভিন্ন ব্যাক অফিস সফটওয়্যার বাধ্যতামূলক করছে ডিএসই

শাফিউন ইবনে শাহীনঃ তামহা সিকিউরিটিজ কেলেংকারির মত অঘটন বন্ধে সোচ্চার হচ্ছে পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) মাসিক ই-স্টেটমেন্ট সেবা চালু করার পর এবার ব্যাক অফিস সফটওয়্যারে জালিয়াতির পথ বন্ধ করতে পদক্ষেপ নিচ্ছে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)।

এ লক্ষ্যে সব স্টক ব্রোকারদের জন্য অভিন্ন ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার বাধ্যতামূলক করতে যাচ্ছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ। খুব শিগগিরই ডিএসই এ সংক্রান্ত নীতিমালা প্রকাশ করবে। নীতিমালা অনুসারে ডিএসইর দেয়া গাইডলাইন মেনেই সব স্টক ব্রোকারদের ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার পরিচালনা করতে হবে। গত রোববার (৬ ফেব্রুয়ারি) ডিএসইর পর্ষদ সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

ইতিমধ্যে ডিএসই এ সম্পর্কিত একটি খসড়া নীতিমালা তৈরী করেছে। এই সপ্তাহের মধ্যেই খসড়াটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশনের কাছে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। সেখান থেকে অনুমোদন পাওয়ার পরেই এ সংক্রান্ত নির্দেশিকা জারি করবে ডিএসই।

বর্তমানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে মোট ৩০৮টি ব্রোকারেজ হাউজ তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। এ সকল হাউজের অভ্যন্তরীণ পরিচালনার জন্য ব্যাক-অফিস সফটওয়্যারের দরকার পড়ে। ব্যাক-অফিস সফটওয়্যারে বিনিয়োগকারিদের অর্থ, শেয়ার ও নগদ জমা-উত্তোলনের হিসেব থেকে শুরু করে প্রতিদিনের লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য পর্যন্ত থাকে। ব্রোকারেজ হাউজে থাকা নগদ অর্থ ও শেয়ারের পরিমান, তাদের করা লেনদেন এবং উত্তোলনের প্রকৃত হিসেবও ব্যাক-অফিস সফটওয়্যারে জমা থাকে। সিডিবিএলের সাথে সংযুক্ত এসব সফটওয়্যারের মাধ্যমে এসইসি ও ডিএসইসি হাউজের ওপর নজরদারি করতে পারে।

তবে কোন অসৎ প্রতিষ্ঠান জালিয়াতি করতে চাইলে সেক্ষেত্রে তারা আরো একটি ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার ব্যবহার করে। এই সফটওয়্যারটির কপি স্টক এক্সচেঞ্জের সাথে সংযুক্ত থাকে না। যার ফলে সেই সফটওয়্যার দিয়ে দিনশেষে তারা নিজেদের মন-মত একটা হিসেব ধরিয়ে দিতে পারে বিনিয়োগকারিদের। তামহা সিকিউরিটিজের মত স্টক ব্রোকাররা এই সুযোগের অপব্যবহার করেই বিনিয়োগকারিদের শত কোটি টাকা জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাত করেছে।

ডিএসই এবার সুযোগের এই অপব্যবহারকেই বন্ধ করতে চাচ্ছে। নতুন নীতিমালা অনুসারে, কোন হাউজ একটির বেশি ব্যাক অফিস সফটওয়্যার ব্যবহার করতে পারবে না। প্রতিটি ব্যাক অফিস সফটওয়্যার ডিএসইর সাথে সংযুক্ত থাকবে। এতে কোন হাউজে কখন কি পরিমান নগদ অর্থ বা শেয়ার লেনদেন হচ্ছে তার প্রকৃত হিসেব সাথে সাথেই পাওয়া যাবে। স্টক ব্রোকার তার গ্রাহকদের পোর্টফোলিওর তথ্যে কোন বিকৃতি কিংবা পরিবর্তন ঘটাতে পারবে না।

যেভাবে মানা হবে নতুন নীতিমালা

বর্তমানে মোটামুটি ৮টি আইটি কোম্পানি ব্রোকারেজ হাউজগুলোকে ব্যাক অফিস সফটওয়্যারের সেবা দিয়ে যাচ্ছে। তাদের সবাইকে নীতিমালায় নির্দেশিত সকল শর্ত ও মানদন্ড মেনে নিয়ে ডিএসইতে তালিকাভুক্ত হতে হবে। এমনকি ব্রোকারেজ হাউজগুলোকেও এইসব কোম্পানির কাছ থেকে সফটওয়্যার নেয়ার আগে এক্সচেঞ্জের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে।

পুঁজিবাজারে থাকা কোম্পানিগুলো তাদের অডিট কার্যক্রম চালানোর জন্য যেভাবে নীরিক্ষক বাছাই করে, ডিএসইকে ঠিক সেভাবে ব্যাক অফিস সফটওয়্যার সরবারহকারি বাছাইয়ের পদ্ধতি অনুসরন করার পরামর্শ দিয়েছে এসইসি। এ পদ্ধতিতে সিএ ফার্মগুলো এসইসির দেয়া নীতিমালা মেনে প্রথমে কমিশনে তালিকাভুক্ত হয়। পরে কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত সেই সিএ ফার্মগুলোর মধ্য থেকে যেকোন একটিকে তাদের নীরিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে দেয়। তেমনি যেসব কোম্পানি ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার সরবরাহ করতে চায় তাদের ডিএসইর দেয়া সকল মানদন্ড ও শর্ত মেনে সফটওয়্যার তৈরী করতে হবে। এরপর ডিএসই পরীক্ষা-নীরিক্ষার পর যদি যোগ্য মনে করে তবেই তারা তালিকাভুক্ত হবে। এরপর ব্রোকারেজ হাউজগুলো সেখান থেকে বাছাই করে তাদের নিয়োগ করতে পারবে।

যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা

বিনিয়োগকারিদের অর্থ ও শেয়ারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই মূলত এই নীতিমালা প্রনয়ন হচ্ছে মন্তব্য করে ডিএসইর প্রথান নির্বাহী কর্মকর্তা এম সাইফুর রহমান মজুমদার বলেন, একই হাউজে একাধিক ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার এখন থেকে আর অনুমোদন করা হবে না। সবাইকে অভিন্ন সফটওয়্যারেই আসতে হবে। কোথাও কোন অসংগতি হলে খুব সহজেই এক্সচেঞ্জ থেকে আমরা চিহ্নিত করতে পারবো। এতে করে ভবিষ্যৎয়ে ব্রোকারেজ হাউজ থেকে হওয়া প্রতারণাগুলো কমে আসবে।

ডিএসইর নতুন এই নীতিমালাকে স্বাগত জানিয়ে ব্রোকারেজ এসোসিয়েশনের সভাপতি রিচার্ড ডি’ রোজারিও পুঁজিবাজার ডটকমকে বলেন, স্বচ্ছতা আনতে যে যা করবে সব কিছুতেই আমাদের সমর্থন থাকবে। তবে জালিয়াতি ঠেকাতে শুধু নীতিমালা করলেই হবে না। তার যথাযথ বাস্তবায়নও করতে হবে। বিদ্যমান যে আইন আছে, জালিয়াতি ঠেকাতে তা যথেষ্ট। এখন শুধু দরকার সেই আইন প্রয়োগের সদিচ্ছা। নতুন নীতিমালা প্রকাশ হোক, তখন আমরা এ নিয়ে আরও স্পষ্ট বক্তব্য রাখতে পারব।

অন্যদিকে অভিন্ন ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার নিয়ে তার শংকার কথাও বললেন ব্রোকারেজ এসোসিয়েশনের সভাপতি। নীতিমালা নিয়ে বিস্তারিত জানালে তিনি বলেন, জালিয়াতি ঠেকাতে ডিএসইর নতুন নীতিমালাকে আমরাও স্বাগত জানাই। তবে একই সাথে খেয়াল রাখতে হবে নতুন কিছু বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যেন আমাদের খরচ বেড়ে না যায়। আমরা কিন্তু এখনও ব্যাক অফিস ব্যবহার করছি। নীতিমালা আসলে নতুন করে আবার ব্যাক-অফিস সফটওয়্যারের জন্য খরচ দিতে হবে। সফটওয়্যারের এই বাড়তি দামও কিন্তু আমাদের ব্যবসার খরচে যোগ হবে। এটা যেন অতিরিক্ত না হয়ে যায় সে বিষয়টা ডিএসইর খেয়াল রাখা উচিত।

নতুন সফটওয়্যারের ব্যবহারবিধিকে সহজ রাখার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তিনি বলেন, নতুন সফটওয়্যার ব্যবহারকারিবান্ধব হওয়াও জরুরি, আমরা কাজ করতে যেয়ে এখন যে ধরনের সুবিধা পাই, নতুন ব্যাক অফিস সফটওয়্যারেও সেসব সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। এটি যেন ব্যবহারকারি বান্ধব হয়। এর জন্য আলাদা টেকনিক্যাল ট্রেইনিংয়ের দরকার হলে সেটি হবে আমাদের উপর মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’র মত।

ঘটনার সুত্রপাত

উল্লেখ্য, সম্প্রতি তামহা সিকিউরিটিজের মিথ্যা তথ্য ও জাল সফটওয়্যার ব্যবহার করে বিনিয়োগকারিদের সঙ্গে প্রতারণার বিষয়টি উঠে আসে। ব্রোকারেজ হাউজটি তার প্রায় দুই হাজার গ্রাহকদের শেয়ার ও জমাকৃত অর্থের হিসাব রাখতে দুটি পৃথক ব্যাক অফিস সফটওয়্যার ব্যবহার করে। একটি দিয়ে প্রকৃত তথ্য এবং অন্যটি দিয়ে ভুয়া প্রতিবেদন তৈরি করত হাউজটি। দুটি পৃথক ব্যাক অফিস সফটওয়্যার ব্যবহার করায় বিনিয়োগকারিরা প্রকৃত তথ্য জানতে পারেনি। এভাবে প্রায় দুই হাজার গ্রাহক তামহা সিকিউরিটিজের প্রতারণার স্বীকার শিকার হয়েছেন। তামহা সিকিউরিটিজের গ্রাহকদের অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় ৮৭ কোটি টাকা সরিয়ে ফেলা হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

এর আগে, বিনিয়োগকারিদের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ব্যাঙ্কো সিকিউরিটিজ এবং ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছিল। ব্যাঙ্কো সিকিউরিটিজের বিরুদ্ধে সমন্বিত গ্রাহক অ্যাকাউন্ট থেকে ৬৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের বিরুদ্ধে ৪৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া, শাহ মোহাম্মদ সগীর সিকিউরিটিজ, ডন সিকিউরিটিজ, সিলেট মেট্রো সিটি সিকিউরিটিজ, ট্রেন্ডসেট সিকিউরিটিজ এবং মোহররম সিকিউরিটিজ লিমিটেডও একইভাবে বিনিয়োগকারিদের অর্থ আত্মসাৎ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে গত ৩০ জানুয়ারি সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) বিনিয়োগকারিদের জন্য নতুন একটি সেবা চালু করে। এই সেবার আওতায় প্রত্যেক বিও একাউন্টধারীর কাছে মাসিক ই-স্টেটমেন্ট বা ই-প্রতিবেদন পাঠানো হবে। তাতে আলোচিত মাসে ওই বিও একাউন্টের সব লেনদেনের তথ্য, বোনাস বা রাইট শেয়ার জমার তথ্য, আইপিওতে শেয়ার বরাদ্দ পেলে ওই তথ্যসহ প্রয়োজনীয় সকল তথ্য অন্তর্ভুক্ত থাকবে। প্রত্যেক মাসের প্রথম সপ্তাহে আগের মাসের প্রতিবেদন ই-মেইলের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারির কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। অবশ্য সিডিবিএল আগে থেকে বিনিয়োগকারির মোবাইলে প্রতিদিনের শেয়ার লেনদেনের তথ্য ক্ষুদেবার্তার মাধ্যমে হালনাগাদ করে আসছিলো।

  • ট্যাগ
  • dse
spot_img

অন্যান্য সংবাদ