মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর 27, 2022

পুঁজিবাজার সম্পর্কে অজ্ঞতাকে দায় দিলেন কোম্পানি সেক্রেটারি

আনলিমার গুজবে প্রতারিত সাধারণ বিনিয়োগকারিরা

শাফিউন ইবনে শাহীনঃ গত কয়েকদিন ধরেই আনলিমা ইয়ার্ন নিয়ে নানা ধরনের মুখরোচক তথ্য ঘুরছিল ফেসবুকে শেয়ারবাজার সম্পর্কিত বিভিন্ন গ্রুপে। কেউ বলছেন, তার শশুরবাড়ি থেকে নিয়ে আসা ৫০ লাখ টাকার পুরোটা দিয়েই আনলিমার শেয়ার কিনবেন আবার কেউ বলছেন তার হাতে থাকা সব শেয়ার বিক্রি করে পুরোটা দিয়ে আনলিমার শেয়ার কিনবেন। তারা মনে করছেন টাকা ডাবল করতে আনলিমার শেয়ারই এখন একমাত্র উপায়। আর এমন মনে করার পেছনে রয়েছে ওই একই গ্রুপে আরও বেশ কয়েকটি পোস্ট। যেসব পোস্টে বলা হয়েছে আনলিমার পর্ষদ সভায় দ্বিতীয় প্রান্তিকে ইপিএস খুব ভালো দেখানো হবে। প্রথম প্রান্তিকের ঋনাত্বক ইপিএসের চাকা এবার উলটো ঘুরবে।
অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারী মাত্রই বুঝতে পারেন এ ধরনের সম্মিলিত পোস্ট যখন ফেসবুকে আসে তার অধিকাংশ তথ্যই শেষ পর্যন্ত গুজব বলে প্রমাণিত হয়। আর এই গুজবের ডামাডোলে কষ্টার্জিত পুঁজি হারায় শেয়ারবাজারের সহজ-সরল সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।

“ধার করে এনে আনলিমার শেয়ার কেনায় পরিবারের কাছে পুঁজির সাথে সাথে আমার সম্মানও এখন সংকটে পড়ে গেছে”
-রোকনুজ্জামান
পুঁজি হারানো বিনিয়োগকারী

আর এবার সেই ফাঁদে পা দিয়েছেন মতিঝিলের এক ব্রোকারেজ হাউজে লেনদেন করা হাবিবুর রহমান (ছদ্মনাম) নামের এক সাধারণ বিনিয়োগকারী। গত ১৮ জানুয়ারি পুঁজিবাজার ডটকমের অফিসে ফোন দিয়ে কাঁদোকাঁদো গলায় বলেন তার করা এই ভুলের কথা। তিনি বলেন, নানা মাধ্যমে লাগাতার আনলিমার পজেটিভ নিউজ পাচ্ছিলাম কয়েকদিন ধরে। সবাই বলাবলি করছিল, বিশ্ববাজারে উর্ধ্বগতিতে থাকা সুতার বাজারে আনলিমার এবার ব্যবসা খুব ভালো হবে। আশেপাশে যাকেই পাচ্ছিলাম সেই বলছিলো আনলিমার শেয়ার কিনতে। আমিও লোভে পড়ে আমার হাতে থাকা অন্য সব শেয়ার বিক্রি করে আনলিমার শেয়ার কিনেছিলাম। কেনার পরেই পর্ষদ সভার দিন দাম পড়ে যায় শেয়ারের। মাইনাস ইপিএসের খবরে শেয়ারে দাম পড়েছে। এখন পোর্টফোলিওতে লোকসানের অংকের দিকে চেয়ে চেয়ে সেই বোকামির মাসুল গুনছি।

“কোম্পানিটির লোকসানের এ ধারাবাহিকতাই বরং অনুমেয় ছিল। কোম্পানিটি যে এবারও লোকসান দিবে তা বিভিন্ন ইন্ডিকেটর দেখে আগেই অনুমান করা গেছে। করোনার পর থেকেই প্রতি প্রান্তিকে ধারাবাহিকভাবে আয় কমে আসছিল কোম্পানিটির। প্রান্তিক ঘোষণার ঠিক ১ মাস আগে হাতের প্রায় সব শেয়ার ছেড়ে দেয়ার ঘোষণা দেয় এক উদ্যোক্তা পরিচালক”
-রাশেদ শেখ
সহ-ব্যবস্থাপক, আইল্যান্ড সিকিউরিটিজ লিমিটেড

হাবিবের মতই একই কথা বলেন ওই হাউজেই লেনদেন করা রোকনুজ্জামান (ছদ্মনাম)। তার হাতে নগদ টাকা না থাকায় শ্যালকের কাছ থেকে ধার করে এনে আনলিমার শেয়ার কিনেছিলেন। বললেন, তার অবস্থা হয়েছে মরার উপর খড়ার ঘায়ের মতো। আগে থেকেই বিভিন্ন শেয়ারে লোকসানে ছিলেন তিনি। এখন ধার করে এনে আনলিমার শেয়ার কেনায় পরিবারের কাছে পুঁজির সাথে তার সম্মানও সংকটে পড়ে গেছে। এই লোকসান থেকে কবে মুক্তি পাবেন তা জানতেই হাবিবের ফোন থেকেই কথা বলেন পুঁজিবাজার ডটকমের সাথে।
ডিএসইতে প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, এবার দ্বিতীয় প্রান্তিকে আনলিমা ইয়ার্ন ডায়িং লিমিটেড এই হিসেব বছরের প্রথম ৬ মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) কোম্পানিটির শেয়ার প্রতি লোকসান হয়েছে ২৩ পয়সা। যেখানে আগের বছর একই সময় আয় ছিল ১৭ পয়সা।

ফেসবুকে রয়েছে এমন বহু পোস্ট

কোম্পানিটির লোকসানের এ ধারাবাহিকতাই বরং অনুমেয় ছিল বলে জানিয়েছেন বাজার বিশ্লেষকরা। পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা আইল্যান্ড সিকিউরিটিজের রাশেদ শেখ বলেন, আনলিমার শেয়ারে কিংবা ব্যবসায় বড় কোন পরিবর্তন যে আসবে না তা বিভিন্ন ইন্ডিকেটর দেখে আগেই অনুমান করা গেছে। করোনা পরবর্তী প্রান্তিকগুলোতে আনলিমা ইয়ার্নের আয় ধারাবাহিকভাবে কমে আসছিলো। তারই প্রেক্ষিতে এই হিসেব বছরের প্রথম প্রান্তিকে দীর্ঘকাল পরে কোম্পানিটি প্রথম লোকসানে আসে। এমন আহামরি কোন পরিবর্তন তাদের পন্যের বাজারে কিংবা কোম্পানিতে ঘটেনি যে লোকসান থেকে কোম্পানিটি পুনরায় মুনাফায় ফেরত আসবে। আর এ বিষয়ে আরও নিশ্চিত হওয়া যায় যখন পর্ষদ সভা ডাকার ঠিক এক মাস আগে এক উদ্যোক্তা পরিচালক হাতে থাকা প্রায় সব শেয়ার ছেড়ে দেয়।
এতো কিছুর পরেও কোম্পানির আয়ে কোন বড় পরিবর্তন আসবে বলে যদি কেউ ধারনা করে থাকে তা একান্তই তার বাজার সম্পর্কে মৌলিক জ্ঞানের অভাব বলে মন্তব্য করেন তিনি।

পরবর্তীতে এ বিষয়টি তুলে ধরে আনলিমা ইয়ার্ন ডায়িংয়ের কোম্পানি সচিব মোহাম্মদ জাহাংগির আলমের সাথে কথা বললে তিনি ওই বিনিয়োগকারিদের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, শেয়ারবাজারের ব্যবসার আসল জিনিসই হচ্ছে তথ্য। কোন তথ্য সঠিক হতে পারে আর কোনটি ভুল হতে পারে সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার সক্ষমতা থাকতে হবে বিনিয়োগকারিদের। এই ডিজিটাল যুগে কারসাজিকারিরা এই তথ্যকে ব্যবহার করেই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পুঁজি লুটে নেয়।
এতদিন লাভে থাকা কোম্পানি হুট করে এই বছর লোকসান কেন দিচ্ছে এই প্রশ্ন করলে তিনি করোনার কথা উল্লেখ করেন। করোনা পরবর্তী সময় থেকে তাদের ব্যবসা খারাপ যাচ্ছে বলে জানান তিনি। এ সময় কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধিতে ব্যবসা সামগ্রিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।
বিশ্ববাজারে সুতার মূল্যও তো বেড়েছে, আবার বাজারে থাকা একই ধরনের অন্য প্রায় সব কোম্পানির আয় এ সময় বেড়েছে সেক্ষেত্রে আনলিমা আয়ের বদলে লোকসানে কেন প্রশ্ন করলে তিনি উত্তরে তাদের উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাওয়ার কথা জানান। তিনি বলেন, আমরা অনেক পুরোনো কোম্পানি। আমাদের মেশিনগুলোও অনেক পুরোনো। এই মেশিনগুলো নতুন কোম্পানিগুলোর আধুনিক মেশিনের মত উৎপাদন করতে পারে না। তার ওপর এগুলোর অনেক বয়স হয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক উৎপাদনও ব্যহত হয় মাঝেমাঝে। তাই প্রত্যাশিত উৎপাদন হচ্ছে না আনলিমার। আর তারই প্রভাব পড়েছে কোম্পানির আয়ে।
এ থেকে উত্তরণের উপায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতে কোম্পানি সাধারণত তাদের আধুনিকায়ন করে থাকে।

তবে আধুনিকায়নের কোন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথা জানাতে পারেননি তিনি। সাধারণত নতুন মেশিনারিজ ক্রয় বা ফ্যাক্টরি উন্নয়নের জন্য রিজার্ভে থাকা টাকা ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তবে আনলিমা ইয়ার্নের রিজার্ভে যেহেতু যথেষ্ট টাকা নেই এমন পরিস্থিতে তাদের রাইট শেয়ার ছাড়ার কোন পরিকল্পনা আছে কিনা জানতে চাইলে বলেন, এখনও এমন কোন সিদ্ধান্ত হয়নি।
কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ বর্তমান অবস্থা থেকে উন্নয়নে কাজ করছেন বলে জানান তিনি। এ সংক্রান্ত কোন তথ্য আসলে সবাই জানতে পারবেন বলে আশ্বস্ত করেন তিনি।
এ বিষয়ে মতামত জানতে চাইলে পুজিবাজার বিশ্লেষক আবু আহমেদ বলেন, আমাদের দেশের সাধারণ বিনিয়োগকারিদের বিনিয়োগজ্ঞান এখনো পরিপক্ক নয়। তারা এখনও অন্যের কথায়, গুজবের ওপর ভিত্তি করে শেয়ার ব্যবসা করতে চায়। বাজারের একটা বড় অংশের বিনিয়োগকারির এমন পাল ধরে ভুল বিনিয়োগের পরে আসলে কোন বাজারই ম্যাচিউর্ড বিহেভ করতে পারে না। এ থেকে বের হওয়ার জন্য সব পক্ষেরই পদক্ষেপ নিতে হবে। বিনিয়োগকারিদের যেমন সচেতন থাকতে হবে তেমনি বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থারও কড়া নজর রাখতে হবে এসব কারসাজিকারিদের বিরুদ্ধে।

অন্যদিকে পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারি ঐক্য পরিষদের সভাপতি মিজানুর রশিদ চৌধুরী বলেন, শুধু বিনিয়োগকারিদের দোষ দিয়েই পার পাওয়া যাবে না। প্রায়ই জানা যায় এ ধরনের কারসাজিতে কোম্পানিগুলোর ভেতরের মানুষজনই জড়িত থাকে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার চোখের সামনে দিয়ে কারসাজিকারিরা সাধারণ বিনিয়োগকারিদের বছরের পর বছর একই উপায়ে প্রতারিত করে আসছে। অথচ এ নিয়ে এখনও কোন শক্ত পদক্ষেপের কোন উদাহরণ তৈরি করতে পারেনি বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো।

spot_img

অন্যান্য সংবাদ