সোমবার, অক্টোবর 3, 2022

পুঁজিবাজারে গতি ফেরাতে এবার প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ

পুঁজিবাজার রিপোর্টঃ দেশের পুঁজিবাজার-সংক্রান্ত বিভিন্ন ইস্যুতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বিএসইসির মধ্যে মতপার্থক্য নিরসনে এই দুই নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে শিগগিরই বৈঠকে বসছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

আগামী সপ্তাহের যেকোনো কার্যদিবসে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে। ব্যাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির এবং পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত- উল- ইসলাম বৈঠকে উপস্থিত থাকবেন।
এছাড়াও বৈঠকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে সচিব আবদুর রউফ তলিুকদার ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব শেখ মোহাম্মদ সলিম উল্লাহর উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

এ বৈঠকের আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের সাথেও প্রধানমন্ত্রী বসতে পারেন বলে জানা গেছে।

কি নিয়ে আলোচনা

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, শীর্ষ চার কর্মকর্তার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ওই বৈঠক থেকে পুঁজিবাজারের জন্য ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসতে পারে। সেক্ষেত্রে ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১ (২০১৩ সালে সংশোধিত)-এর ২৬ এর (ক) ধারার সংশোধনী নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্কুলার জারির মাধ্যমে বিনিয়োগসীমার প্রচলিত পদ্ধতি পরিবর্তন করা যায় কি-না তা নিয়েও আলোচনা হতে পারে।

এই ধারায় পুঁজিবাজারে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগসীমা বাজারদর ধরে নির্ধারণ করা রয়েছে। কিন্তু এর ফলে বাজার অস্থির হয়ে উঠছে বলে বিএসইসির পক্ষ থেকে তা সংশোধনের দাবি করে আসছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। বিএসইসি শেয়ারের ক্রয়মূল্য ধরে বিনিয়োগসীমা নির্ধারণ করার দাবি করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। একই সঙ্গে বিনিয়োগসীমা থেকে বন্ডের হিসাব বাদ দেওয়ারও দাবি করে আসছে বিএসইসি।

এই আইনের আওতায় ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ইকুইটির ওপর ভিত্তি ধরে বিনিয়োগসীমা ধার্য করা হয়েছে। ইকুইটি হলো কোনো কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন, মুনাফা বা ফ্রি রিজার্ভের যোগফল। এই ইকুইটির ২৫ শতাংশ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করার সুযোগ পাবে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। সেক্ষেত্রে প্রতিদিনের শেয়ারের বাজার দরকে বিবেচনায় নিতে হয়। শেয়ারের এই দর ধরে বিনিয়োগসীমা নির্ধারণ পদ্ধতির কারণেই বাজার অস্থির হয়ে পড়েছে বলে মনে করছে বিএসইসি।

বিদ্যমান আইন অনুসরণ করার ফলে প্রায়ই ব্যাংকগুলো বিনিয়োগসীমা লঙ্ঘন করতে হচ্ছে। আর সে কারণে জরিমানা গুণতে হচ্ছে প্রায়ই। একই সঙ্গে বাড়ছে শেয়ার বিক্রির চাপ। তাতে বাজারে ছড়িয়ে পড়ছে আতঙ্ক।

তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে এই নিয়ম বদলানোর জন্য সুপারিশ করে আসছে বিএসইসি। এ নিয়ে দুটি সংস্থার মধ্যে সৃষ্ট দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে গত ১ ডিসেম্বর বাংলাদেশে ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির কারণে।

এই দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসার পর অস্থির পুঁজিবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থার সঙ্কট তীব্র হয়ে ওঠে। আর এ মতপার্থক্য নিরসনের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে এই বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত ৩০ নভেম্বরঃ বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসি

কয়েক মাস ধরে দুই নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের মতো বিভিন্ন ইস্যুতে মতবিরোধ দেখা দেয়। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পুঁজিবাজারে। দুই নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিরোধ প্রকাশ্য রূপ নেয়ায় টানা আট কার্যদিবস দরপতন হয় পুঁজিবাজারে।

এ পরিস্থিতিতে গত ৩০ নভেম্বর বৈঠকে বসে এই দুই নিয়ন্ত্রক সংস্থা। বৈঠক শেষে বিএসইসি কমিশনার শেখ শামসু‌দ্দিন আহমেদ বলেন, পুঁজিবাজারের অদা‌বিকৃত ডিভিডেন্ড নি‌য়ে গঠিত স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ডের ব্যাপারে একমত বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে বিষয়‌টি নিয়ে কিছু আইনগত অস্পষ্টতা রয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে কথা হয়েছে। বিএসই‌সি-বাংলাদেশ ব্যাংক উভয়পক্ষ এ বিষ‌য়ে আন্তরিক। আমা‌দের কা‌রও সঙ্গে কারও কোনো মতবিরোধ নেই।

বিএসইসির এই কমিশনার বলেন, বৈঠকে আমার মনে হয়েছে পুঁজিবাজারের উন্নয়নে বাংলাদেশ ব্যাংক খুবই আন্তরিক। যে কারণে তারা বন্ডে বিনিয়োগকে বিনিয়োগ সীমার বাহিরে রাখার অঙ্গীকার করেছেন। এছাড়া বিনিয়োগ সীমা গণনায় বাজার দরের পরিবর্তে কস্ট প্রাইসকে বিবেচনায় নেয়ার যে দীর্ঘদিনের চাহিদা রয়েছে, সেটাও তারা সমাধান করবে। এ জন্য যা করণীয় তারা তাই করবেন।

বিএসইসির বক্তব্যে অসম্মতি বাংলাদেশ ব্যাংকের

বিএসইসির পক্ষ থেকে এমন বক্তব্য আসার পর ১ ডিসেম্বর পুঁজিবাজারে বড় উত্থান হয়। ডিএসইর প্রধান সূচক একদিনে বেড়ে যায় ১৪৩ পয়েন্ট। তবে ওইদিন সন্ধ্যার দিকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, বৈঠকে কোন সিদ্ধান্ত হয়নি।

বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়, পুঁজিবাজারে তফসিলি ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ সংক্রান্ত অন্যান্য বিষয়ে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

এতে আরও বলা হয়, ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান ১৯৯৩-এ পুঁজিবাজারে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগের বিষয়ে বিদ্যমান কতিপয় আইনি সীমাবদ্ধতার বিষয়ে বিএসইসির প্রতিনিধি দলকে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সভার পরে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের প্রতিনিধির বরাত দিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ওই সভার কতিপয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের যে সংবাদ প্রচার করা হয়েছে, তা সঠিক নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর একেএম সাজেদুর রহমান খানের সভাপতিত্বে বিএসইসির সঙ্গে পূর্ব নির্ধারিত এ সভা কেন্দ্রীয় ব্যাংক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়।সভায় বিএসইসির উদ্যোগে ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড গঠনের ফলে তফসিলি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সৃষ্ট জটিলতা নিরসন এবং পুঞ্জিভূত লোকসান বিদ্যমান থাকলেও সংশ্নিষ্ট বছরের মুনাফা হতে নগদ লভ্যাংশ বিতরণের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

এছাড়া সভায় ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১ এর ৩৫(১)(গ) ধারা ও ২২ ধারা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন ১৯৯৩ এর ১০ ধারার বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করে ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ডে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অদাবিকৃত তহবিল স্থানান্তর এবং পুঞ্জিভূত লোকসান থাকা সত্ত্বেও নগদ লভ্যাংশ দেওয়া আইনসম্মত নয় বলে অভিহিত করা হয়েছে। এ বিষয়ে বিএসইসির নির্দেশনায় প্রয়োজনীয় সংশোধন আনতে অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এমন সংবাদ বিজ্ঞপ্তি আসার পর ওইদিন রাতেই শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন গ্রুপে বিনিয়োগকারীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এতে বিনিয়োগকারীদের এক ধরনের আতঙ্কের চিত্র উঠে আসে।

আর পরের দিন ২ ডিসেম্বর লেনদেন শুরু হতেই বাজারে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ডিএসইতে লেনদেন শুরু হতেই প্রধান মূল্য সূচক ৮৬ পয়েন্ট পড়ে যায়। তবে পুঁজিবাজার নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বৈঠকের তথ্য প্রকাশ হওয়ার পর ওইদিনই পুঁজিবাজারে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। শুরুর বড় পতন কাটিয়ে বড় ধরনের উত্থান দিয়ে দিনের লেনদেন শেষ হয়। ওইদিন ডিএসইর প্রধান মূল্য সূচক বাড়ে ৮৯ পয়েন্ট। এর পরে প্রত্যেক কার্যদিবসই সূচকের উত্থানে লেনদেন হয়েছে।

কোন সুখবর না দিয়েই শেষ হয় গতকালের বৈঠক

তবে গতকাল মঙ্গলবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের বহুল প্রতীক্ষিত বৈঠকে তেমন কোন সুবার্তা না আসায় টানা ৬ কার্যদিবস উত্থানের পর আজ বুধবার আবারো পতনে মোড় নিয়েছে শেয়ারবাজার।

গতকাল মঙ্গলবার (৭ ডিসেম্বর) পুঁজিবাজারের অস্থিরতা নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) বৈঠক হয়েছিল। তবে এ বিষয়ে গণমাধ্যমকর্মীদেরকে তেমন কিছুই জানানো হয়নি। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এবং শেয়ারবাজার কার্যক্রম সমন্বয় ও তদারকি কমিটির আহ্বায়ক মফিজ উদ্দীন আহমেদের সভাপতিত্বে বহুল প্রতীক্ষিত এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির পক্ষে উপস্থিত ছিলেন নির্বাহী পরিচালক সাইফুর রহমান ও মাহবুবুল আলম। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে ছিলেন অফ সাইট সুপারভিশন বিভাগের মহাব্যবস্থাপক আনোয়ারুল ইসলাম। এসময় বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বিএসইসির প্রতিনিধি ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, অর্থ বিভাগ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান আইসিবির প্রতিনিধি।

বৈঠক শেষে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সাংবাদিকরা বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক সাইফুর রহমানের কাছে বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বৈঠকের বিষয়ে নাহিদ ভাই (আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের যুগ্ম সচিব ড. নাহিদ হোসেন) কথা বলবেন।’

এরপর সাংবাদিকরা যুগ্ম সচিব নাহিদ হোসেন এবং অতিরিক্ত সচিব মফিজ উদ্দীন আহমেদের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে তারা কথা বলতে চাননি।

তবে যুগ্ম সচিব নাহিদ হোসেন এবং বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক সাইফুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বলেন, বৈঠকে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, পুঁজিবাজারের চলমান অস্থিরতা নিয়ে অর্থমন্ত্রণালয়ের চলমান বৈঠকে কোন সিন্ধান্ত হয়নি। তবে আলোচনা ইতিবাচক হয়েছে। ২০১৯ সালের যে বিষয়গুলো নিয়ে অর্থমন্ত্রীর সাথে আলোচনা হয়েছিল সেই বিষয়গুলো নিয়ে আজকে আলোচনা হয়েছে। আগামী একমাসের মধ্যে যার যার অস্থানের প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। এ মাসে বা আগামী একসপ্তাহের মধ্যে আরও একটি বৈঠক হতে পারে। সেই বৈঠকের পর পুঁজিবাজারে দৃশ্যমান কিছু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

spot_img

অন্যান্য সংবাদ